বাইক বা সাইকেলের ভারসাম্য থাকার পেছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী?

January 07, 2023

বাইক বা সাইকেলের ভারসাম্য থাকার পেছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী?

আমরা সবাই কমবেশি সাইকেল চালাতে জানি। তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো আমরা দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারি। দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা কিন্তু আমাদের জন্য বড় এক অর্জন, যেখানে পৃথিবীর বেশির ভাগ জন্তুই দুই এর অধিক পা দিয়ে চলাফেরা করে। আমরা দুই পায়ে হাঁটতে পেরেও দুই চাকাওয়ালা সাইকেল দেখেও আমাদের বিস্মিত হতে হয়। মনে প্রশ্ন জাগে কিভাবে দুই চাকা দিয়ে সাইকেল এগিয়ে চলে। সেই বিস্ময় উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মাথায়। খুব সাধারণ ভাবে চিন্তা করা যাক। আমরা যখন হাঁটি দুই পা কিন্তু একসাথে হাটার জন্য ব্যাবহার করিনা। কথাটা ভুল ভুল লাগছে তাইনা। এবার একটু হাতে কলমে দেখা যাক মানে হেঁটে দেখা যাক। এই হেঁটে দেখার প্রক্রিয়াটা খুব আস্তে আস্তে হবে। আপনি যদি বসে থাকেন উঠে দাড়িয়ে পরুন। এক পা সামনের দিকে এগিয়ে দিন আরেকপা উঠানো থাকবে।

উঠিয়ে রাখা পা সামনে এগিয়ে দিয়ে অপর পা উঠিয়ে ফেলুন। এভাবে আমরা সামনে এগিয়ে যায় তাই না! এখন লক্ষ্য করুন যখন একপায়ে দাড়িয়ে ছিলাম তখন ভারসাম্য রাখতে আমাদের বেগ পেতে হয়েছে। তখন অন্য পা এগিয়ে এসেছে সমতা আনার জন্য। এভাবে আমরা দুই পা এর উঠানামার মাধ্যমে হাঁটা-চলা সম্পন্ন করি।

বাইসাইকেলের ব্যাপার টাও এরকম। বাইসাইকেলের রয়েছে প্যাডেল। যেখানে আমরা পা দিয়ে চাপ দিয়ে সাইকেল এগিয়ে নিই। এই প্যাডেলের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে বামপাশে চাপ প্রয়োগ করলে ডান পাশে কোনো চাপ প্রয়োগ করতে হয় না। একইভাবে ডানপাশে চাপ প্রয়োগ করলে বামপাশে চাপ প্রয়োগ করতে হয় না। বিষয়টা অনেকটা আমাদের দুই পায়ে হাঁটার মত তাই না! যদিও ব্যাপার টা খুবই দ্রুত ঘটে থাকে। এগুলো তো গেলো ভেবে দেখার প্রক্রিয়া। বিজ্ঞান দিয়েও তো বুঝতে হবে তাই না!

দেখি পদার্থবিদ্যা কি বলে?!

সাইকেল দেখতে খুব সহজ -সরল। কিন্তু এটার পিছনে বিজ্ঞান টা জটিল। খুব বড়সড় একটা বই ই আছে এই বিজ্ঞান নিয়ে। বাইসাইকেল আসলে অতটা হিসেব নিকেশ করে বানানো হয়নি, যতটা আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে। বানাতে বানেতে ত্রুটি ধরা পরলে সেই ত্রুটি ঠিক করে আবার পরীক্ষা করতে করতে বাইসাইকেল আজকের পর্যায়ে এসেছে। বাইসাইকেল চালানো শিখা আরো বেশি সহজ এর পিছনে মাথা ঘোরানো বিজ্ঞানের তুলনায়।

প্রশ্ন ছিলো ভারসাম্য নিয়ে

প্রথমে সাইকেল কে এমন ভাবে গঠন করা হয়েছিলো যাতে তা চালক ছাড়াই নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। এই পরীক্ষাটা নিজের কাছে সাইকেল থাকলে করে দেখতে পারেন। সাইকেল টা নিয়ে সজোরে ধাক্কা দিন। দেখা যাবে সাইকেল সোজাসুজি কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে তারপর পরে গেছে। যতক্ষণ সেটার উপর বল কাজ করেছে ততক্ষণ সোজাসুজি চলছিলো। যেইমাত্র প্রয়োগকৃত বল শেষ হয়ে গেলো অমনি সাইকেল পরে গেলো।

আমরা যখন সাইকেল চালাই একই কাজ ই করে থাকি। মানে বল প্রয়োগ করতেই থাকি, যা পূর্বের কথাটার পুনরাবৃত্তি। সাইকেলের। নিচের ছবিটা একটু লক্ষ্য করুন :

চাকার দিকে ট্রেইল বলে একটা কথা আছে। ট্রেইল বলতে বুঝায় সাইকেলের চাকা যে বিন্দুতে ভূমি স্পর্শ করেছে সেখান থেকে মূল অক্ষ যেখানে শেষ হয়েছে সেই দূরত্ব টা। এই ট্রেইল ই সাইকেলকে ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। আপনি সাইকেল চালানোর সময় সাইকেলের চাকা যত সোজা রাখতে পারবেন ততই সাইকেলের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবেন। সাইকেলের চাকা যদি ডানে বা বামে ঘোরানো হয় তাহলে ট্রেইল কমে যায় আর সাইকেলও ভারসাম্য হারায়। যখন কেউ নতুন সাইকেল চালানো শিখে এই ট্রেইলেই ভুল করে থাকে। লক্ষ্য করে দেখবেন, নতুন সাইকেল শেখার সময় হ্যান্ডেল ডানে বামে ঘোরাতে থাকে, মানে স্থির রাখতে পারেনা, যার ফলে ট্রেইল কমে যায় আর সাইকেল সহ পরে যায়৷ এখানে ট্রেইল বিষয় টা যদি পরিষ্কার না হয় আরো কিছু কথা বলি। আমরা যে স্টিয়ারিং দিয়ে সাইকেলের সামনের চাকা ঘুরাই মানে স্টিয়ারিং বরাবর সোজাসুজি একটা দাগ টানুন (বাঁকানো অংশটা বাদ দিয়ে), ছবিতেই দেখুন লাল দাগ দিয়ে দেখানো হয়েছে। এই দাগ টা টানা হয়ে গেলে আরো একটা দাগ টানুন চাকার কেন্দ্র থেকে অর্থাৎ যেখানে চাকার নাট লাগানো থাকে সেখান থেকে ভুমি বরাবর সোজাসুজি। দুইটি দাগের মাঝে একটি দূরত্ব পাবেন, এই অল্প দূরত্বই ট্রেইল।

ট্রেইল নির্ণয়ের সূত্রটি নিম্নরূপ:

Tr=(Rw.cosA−O)sinA

এখানে,

Rw হলো চাকার ব্যাসার্ধ্য, A হচ্ছে ভূমির সাথে স্টিয়ারিং এর আনত কোণ আর O হল বাঁকানো অংশের দূরত্ব যাকে rake বলে দেখানো হয়েছে ছবিতে। Tr হলো নির্ণিত ট্রেইল। এই সূত্রটি প্রয়োগ করে সহজে নির্ণয় করে ফেলা যাবে ট্রেইল কতটুকু হবে। আবারো বলছি ট্রেইল যত বেশি তত ভারসাম্যতা।

এখন আমরা অন্য দুইটি স্থিতিমাপকের সাথে পরিচিত হবো।

ছবিতে দেখানো θ হলো সাইকেলের আনত কোন আর α হলো স্টিয়ারিং ঘুরানো হলে উৎপন্ন কোণ। এখন চালক যদি সাইকেলের উপর বসে ডানদিকে হেলে তাহলে θ এর মাণ ধনাত্মক আর বামদিকে হেলে গেলে তাহলে এর মাণ ঋণাত্মক। চালক সামনের চাকা যদি ডানদিকে ঘুরাই তাহলে α এর মাণ ধনাত্মক আর বামদিকে ঘুরালে ঋণাত্মক। সাইকেলের ভারসাম্য রাখার জন্য এই দুইটি কোণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইটি কোণের মাণ যদি শূন্যের আশেপাশে থাকে অর্থাৎ যদি প্রায় শূন্য হয় তবেই সাইকেল অধিক ভারসাম্য পায়। কিন্তু যদি সামনের চাকা আমরা একেবারেই ঘুরাতে না পারতাম অর্থাৎ একেবারে সোজাসুজি ধরে রাখলেও সাইকেলের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই সাইকেলের সামনের চাকাকে হালকা ঘুরাতে হয় এবং চালকেরও সাইকেলকে হেলানোর প্রয়োজন হয়। এই কারণেই এই দুইটি কোণের মাণ ধনাত্মক বা ঋণাত্মক হয়।

জাইরোস্কোপিক প্রতিক্রিয়াও সাইকেলের ভারসাম্য রাখতে অল্প ভুমিকা রাখে। আমরা যারা স্মার্টফোন শব্দটি ব্যবহার করি তারা কমবেশি এই জাইরোস্কোপ শব্দটির সাথে পরিচিত। এইক্ষেত্রে একটু সহজ ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করি। আমাদের উপরের কোণদুটি আবারো বিবেচনায় আনতে হবে। যখন সাইকেলের সামনের চাকা ডানপদিকে ঘুরে যায়, তখন চালক নিজেকে বামদিকে হেলিয়ে দিয়ে অর্থাৎ সাইকেলকে বামদিকে হেলিয়ে ভারসাম্য আনতে চান। অর্থাৎ যদি α এর মাণ ধনাত্মক হয় তখন θ এর মাণ ঋণাত্মক করতে হবে সাইকেলের ভারসাম্য আনতে। এই প্রতিক্রিয়াটিই জাইরোস্কোপিক প্রতিক্রিয়া। সাইকেল যত বেশি বেগে চলবে জাইরোস্কোপিক প্রতিক্রিয়া তত সক্রিয় হবে। এই প্রতিক্রিয়াটি সম্পূর্ণ চাকার উপর নির্ভরশীল।

সাইকেলের চাকার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপারটি প্রযোজ্য। জাইরোস্কোপিক প্রতিক্রিয়াটি সাইকেলের ভারসাম্য রক্ষার্থে বিপুল ভুমিকা না রাখলেও অল্প ভুমিকা রাখে। এতক্ষণ তো বললাম সাইকেলকে সোজাসুজি রাখার জন্য কি করতে হবে। এখন যখন সাইকেল হেলিয়ে আমরা কোনো বাঁক নিই তাহলে কিভাবে আমরা ভারসাম্য রাখবো।

রাস্তার সাইকেলের কেন্দ্রমুখী ত্বরণকে কাটাকুটি করার জন্য আমাদের বাঁক নিতে হয়। বাঁক নেয়ার বিষয়টি আমরা একটু গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখবো।

লালা দাগ দেয়া বিন্দুটি হল সাইকেলের ভরকেন্দ্র। এটার স্বাপেক্ষেই ভারসাম্যের বাকি গাণিতিক হিসেব টা আমরা করবো।

এখানে θ হলো আণত কোণ, R হচ্ছে G থেকে মানে সাইকেলের ভরকেন্দ্র থেকে পরিমাপকৃত ব্যাসার্ধ, a হচ্ছে কেন্দ্রমুখী ত্বরণ, m হচ্ছে চালক সহ সাইকেলের ভর, g হচ্ছে অভিকর্ষ ত্বরণ, L হচ্ছে সাইকেলের ভরকেন্দ্র G হতে সাইকেলের যে বিন্দুতে সাইকেলের চাকা ভূমি স্পর্শ করেছে (P বিন্দু) এর দূরত্ব, N হচ্ছে স্বাভাবিক বল যা সাইকেল ও ভূমির সাথে ক্রিয়ারত, F হচ্ছে ঘর্ষণবল।

উল্লম্বদিকে যেহেতু কোনো ত্বরণ নেই সেক্ষেত্রে উল্লম্বদিকে বল হবে শূন্য।

তাহলে, স্বাভাবিক বল হবে, N=mg

আনুভূমিক দিকে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র প্রয়োগ করে পাই

F=ma=m(v2R)

এখানে v হচ্ছে বাঁক নেয়ার সময় সাইকেলের গতিবেগ

G বিন্দুর স্বাপেক্ষে মোট ভ্রামক :

Nsinθ.L−Fcosθ.L=0

উপরের তিনটি সূত্র একত্রিত করে আমরা আণত কোণ θ এর জন্য একটি রাশি পাবো।

এক্ষেত্রে তৃতীয় সূত্রটি থেকে শুরু করতে হবে। সূত্রটিতে যথাক্রমে N এবং F এর মাণ বসিয়ে আমরা নিম্নোক্ত রাশিটি পাবো :

tanθ=v2Rg

এই সূত্রটি বেগ, অভিকর্ষজ ত্বরণ এবং আণত কোনের মধ্যে সম্পর্ক নির্দেশ করছে। কত কোণে আণত হলে সাইকেলটি ভারসাম্যতা বজায় রাখবে সেটা এই সূত্র থেকে অনুধাবন করা যাবে।

তথ্যসূত্র:

Bicycle Physics